
মোঃ ফয়সাল হোসেন কয়রা উপজেলা প্রতিনিধি: দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লবণাক্ততার কারণে নিরাপদ ও সুপেয় পানির উৎস ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি অনুপ্রবেশ এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে এ অঞ্চলের মানুষের সুপেয় পানির সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে নিরাপদ পানির জন্য দূরবর্তী উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে পরিবারের সদস্যদের, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের, দীর্ঘ সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি অর্থও ব্যয় হয়।
এই বাস্তবতা সরেজমিনে দেখতে এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কথা সরাসরি শুনতে ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদি ইউনিয়নে অবস্থিত খান সাহেব কোমর উদ্দীন ডিগ্রি কলেজের হলরুমে নিরাপদ পানি ও জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ক একটি বিশেষ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট (বিসিসিটি)-এর উদ্যোগে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় আয়োজিত এই কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামিক রিলিফ বাংলাদেশ-এর বিশেষজ্ঞ ও প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন। তাঁরা উপকূলীয় এলাকার পানি সংকটের বাস্তব চিত্র, লবণাক্ততার প্রভাব, স্থানীয় মানুষের পানি সংগ্রহের দুর্ভোগ এবং বিদ্যমান পানি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। পাশাপাশি স্থানীয় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মতবিনিময় করে তাঁদের অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন ও প্রত্যাশা শোনেন।
উক্ত কর্মসূচিতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইউনেস্কো চেয়ার ড. মোহাম্মদ নুরুন্নবী এবং বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ও হালদা নদী বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মঞ্জুরুল কিবরিয়া অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের উপস্থিতি স্থানীয় বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট শুধু একটি পানি-সংকট নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য, নারী ও শিশুর শ্রম, জীবিকা এবং স্থানীয় মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে এই সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় বাস্তবতা ও জনগণের মতামতকে অগ্রাধিকার দিয়ে সামগ্রিক, দীর্ঘমেয়াদি, কম খরচের এবং টেকসই সমাধান গ্রহণ করা প্রয়োজন।
স্থানীয় মানুষের মতামত, তাদের প্রয়োজন ও বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি বিবেচনায় বৃষ্টির পানির যথাযথ ব্যবহার এবং সংরক্ষণকে এ অঞ্চলের নিরাপদ পানির একটি পরীক্ষিত, তুলনামূলক কম খরচের, বাস্তুতন্ত্র-বান্ধব ও টেকসই সমাধান হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বর্ষাকালে প্রয়োজন অনুযায়ী বৃষ্টির পানি ব্যবহার এবং শুষ্ক মৌসুমের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে এই পানি সংরক্ষণ করে তা ব্যবহার করা গেলে দূরবর্তী এবং ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে পানি সংগ্রহের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ বা পৃষ্ঠস্থ পানিতে লবণাক্ততার হার কমবে।
এ উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও মালিকানা নিশ্চিত করা। শুধু অবকাঠামো স্থাপন করেই কার্যক্রম শেষ না করে স্থানীয় জনগণের মতামত এবং নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করা। এই সভায় বৃষ্টির পানির যথাযথ ব্যবহার এবং সংরক্ষণের জন্য ট্যাংক স্থাপন, জলাধার পুনঃখনন, ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ব্যবহারকারীদের ঐক্যবদ্ধ করা, প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ প্রদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার ব্যবস্থা রাখার জন্য বলা হয়।
কর্মসূচিতে স্থানীয় জনগণের বক্তব্য, অভিজ্ঞতা ও সমস্যাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। একজন স্থানীয় ভুক্তভোগী বলেন, “বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের এই ব্যবস্থা পাওয়া গেলে আমাদের দীর্ঘদিনের খাবার পানির কষ্ট দূর হবে। শুষ্ক মৌসুমে আর দূরে পানি আনতে যেতে হবে না। এই ব্যবস্থা উপজেলার সকল মানুষের জন্য করা উচিত।”
স্থানীয় জনগণের এ প্রত্যাশা তুলে ধরে বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিনিধিগণ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রকল্পের সফলতা শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না; বরং স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন, অংশগ্রহণ, মালিকানা এবং ব্যবস্থাপনায় তাঁদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা বা তাঁদের নেতৃত্বে একটি উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই ক্ষেত্রে সম্প্রতি প্রণীত “স্থানীয় নেতৃত্বে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন জাতীয় কর্মকাঠামো এবং পরিকল্পনা” বাস্তবায়নের একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পক্ষে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের (বিসিসিটি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব কাজী রওনকুল ইসলাম এর নির্দেশনায় স্থানীয় মানুষের বাস্তব সমস্যা, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন তথ্যকে সমন্বয় করে জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কাজকে সর্বোচ্চ কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁর নির্দেশনার মূল লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবসম্মত, বাস্তুতন্ত্র-বান্ধব ও টেকসই উদ্যোগ গ্রহণ করা। সাথে সাথে স্থানীয় নেতৃত্বে সরকারি জলবায়ু অর্থায়নের সুফল স্থানীয় পর্যায়ে আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির জন্য একক কোনো সমাধানের পরিবর্তে স্থানীয় পরিবেশ, পানির প্রাপ্যতা, লবণাক্ততার মাত্রা, জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন এবং স্থানীয় ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার বৃদ্ধি, বিদ্যমান পানির উৎসের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা, প্রয়োজনীয় পানি পরিশোধন, নিয়মিত মান পরীক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা—এসবকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপদ পানির অধিকার আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। স্থানীয় জীবিকা এবং গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনার ধরন বিবেচনায় এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় নারী এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন অত্যাবশ্যক।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় অভিযোজনমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে। বিসিসিটি-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড ২০০৯-১০ অর্থবছরে সরকারি নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন, প্রশমন ও গবেষণাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
কয়রার আজকের এই কর্মসূচি সেই বৃহত্তর জলবায়ু অভিযোজন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে স্থানীয় বাস্তবতা ও মানুষের অভিজ্ঞতাকে নীতিনির্ধারণ ও প্রকল্প পরিকল্পনার সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। বিশেষজ্ঞদের মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে নিরাপদ পানি ও জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ক কাজ আরও কার্যকরভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন।